কবি অক্ষয়চাঁদ সম্পর্কে * স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত
কবি অক্ষয়চাঁদ সম্পর্কে
স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত
দিন দুই আগে, কবি অক্ষয়চাঁদ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিলোনা । তাঁর নাম শুনিনি, কবিতা কোনো পত্রিকায় পড়িনি, কাব্যগ্রন্থ অনেক পরের ব্যাপার ! এই যে তাঁকে জানতাম না, অথচ বাংলা কবিতা নিয়ে মোটামুটি খোঁজখবর রাখি, এটি একদিক থেকে তাঁর সফলতাই । কবি অক্ষয়চাঁদ, কবিতার লেখার সঙ্গে সঙ্গে, নিজের কবি পরিচয়কে, আত্মপ্রতিষ্ঠার সকল প্রয়াসকে অবলীলায় এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছেন !
যদি দশকের হিসেব ধরা হয়, কবি অক্ষয়চাঁদ সত্তর দশকের কবি । এখন বয়স তেষট্টি বছর । কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ষোল । তাঁর কথায়, ‘কবিতা বেচে ভাত খাই’ । সে কথায় পরে আসছি ।
প্রসেনজিত(Prasenjit), আমার বন্ধু, একাডেমি থেকে নাটক দেখে বেরিয়ে আসার সময়, একজনের অনুরোধে তাঁর একটি বই কিনতে আগ্রহী হয় । তিনি আরও শোনান, কবিতা লেখার জন্য চাকুরী হারাতে হয়েছে, ব্যবসা এখন আর নেই, কবিতার বই বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি । ইনি, কবি অক্ষয়চাঁদ । এই সব প্রসেনজিতের কাছ থেকে শোনার পর, আমার বইটি সম্পর্কে কৌতূহল জন্মায় মূলত দুটি কারণে । প্রথমত, একেবারে একা একা যাঁরা এভাবে লেখেন, এমন কি, পত্র-পত্রিকা থেকেও দূরে থাকেন, তাঁরা আসলে কবিতাকে কেমন ভাবে ভাবেন, এটি জানা । দ্বিতীয়ত, কেমন কবিতা লিখলে আমাদের সময়ে সংসার চালানো যায়, তার একটি খোঁজ নেওয়া ।
বইটির প্রচ্ছদ দেখেই বইটি বাদ দেওয়া যায় । কিন্তু আমার ভাল লাগল । এমনটাই তো হওয়ার কথা । এই প্রচ্ছদ যদি, অসামান্য, অভূতপূর্ব হত, তাহলেই খটকা লাগত । বইটির নামও খুব মানিয়ে যায়, ‘মালকোষ’ । কিন্তু বইটি সুন্দরভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে । ছাপা, কাগজ, এবং বানান সবকিছুই নিখুঁত । মোটামুটি এমন একটি মানসিকতা নিয়ে বইটি খুলে, প্রথম কবিতাতেই অবাক হই, নড়েচড়ে বসি :
হে অদৃষ্ট, প্রত্যক্ষ করো এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়, আধখানা
চাঁদের আলোয়, দ্যাখো কতটা রক্তক্ষয় নিয়ত; মধ্যরাত্রির
গভীরে ডুবে গিয়ে ভেসে ওঠে যার জাগরণ তার রঙ নীল
আর অব্যক্ত ঊর্ধ্ব তার পরিসর, যার সর্বত্র রক্তের ফোঁটা ফোঁটা
দাগ । যে পথ শুধু পাথরের, যেথা অন্তরের করুণা ভিন্ন
অন্য কোনো সরোবর নেই, প্রতিধ্বনি নেই, শুধুমাত্র প্রান্তিক
পরিমিতি তার একমাত্র অবয়ব, চলাচল এইরূপ, শূন্যময় ।
অতলান্ত প্রকৃতি তার অন্তর্গত, পদ্মসম, মহাপৃথিবীর
আলো অনন্ত কুসুম যতিচিহ্নহীন যার জ্যোতি ।
এরপর, একটির পর আর একটি কবিতায়, একজন প্রকৃত কবিকেই আবিষ্কার করে চলি । তাঁর সঙ্গে ফোনেও কথা বলি । বইয়েই লিখে দিয়েছিলেন নিজের মোবাইল নাম্বার । ফোনেই যখন তাঁকে পড়ে শোনাই তাঁরই কবিতা, অপর প্রান্তে তিনি মুগ্ধ শ্রোতার মতো নীরব থাকেন :
সারাদিন পাথরের সাথে কথা বলি ।
ছোটবেলার কথা বলি, নিজস্ব
ঘুড়ির কথা বলি ।
তারপর চুপ করে থাকি পাথরের মতন ।
চুপ করে থাকে চরাচর,
মুখ নিচু করে থাকে বাঁশি ।
বাঁশির মাথার ওপর একফালি চাঁদ
দ্যাখে, মানুষ ও পাথর
কীভাবে মুখোমুখি স্থির হয়ে আছে ।
কবিতা শেষ হওয়ার পরেও তিনি নীরব । আমি আবার সেই নীরবতা ভেঙে দিলে, তিনি বলেন, ‘ ঈশ্বরের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে আপনি আমাকে ফোন করলেন ’ ।
— আপনার কবিতা পত্রপত্রিকায় কোথাও পাঠান না, প্রকাশিত হয় না কোথাও ?
— না, আসলে আমি মনে করি যে, কখনো কোনো কবির কোথাও লেখা পাঠানো উচিত নয় । যারা লেখা ছাপায় তাদের কবির কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করা উচিত। এবার আমার কাছে এসে, যারা আমার কাছের মানুষ, তারা যখন লেখা চেয়েছে, নিয়ে গেছে, আমি লেখা দিয়েছি ! আমি কখনো কাকেও বলিনি, যে আমার লেখাটা ছাপাতে হবে, বা আমি কখনো লেখা পাঠিয়েছি এরকম আমার জীবনে ঘটেনি ।
— কাছের মানুষ কারা কারা, পত্রিকায় যারা আপনার লেখা ছাপিয়েছে ?
— যেমন ধরুন আমার একগুচ্ছ লেখা একসময় ছাপিয়েছিল, ‘তিরপূর্ণি’ বলে একটি পত্রিকা তখন মেদিনীপুর থেকে বেরুত । তারপরে, টালিগঞ্জ থেকে, মানে আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে একটি পত্রিকা বেরয়, ‘এবং কথা’ বলে, তারপর আর একটা পত্রিকা বেরয়, টালিগঞ্জ নেতাজীনগর থেকে ‘কুবোপাখি’ বলে, এরাও আমার কিছু লেখা ছাপিয়েছে ।
খুব অল্পই ছাপা হয়েছে, দু-একবারই হয়েছে । আসলে কবিতা ছাপানোর জন্য যে সমস্ত কাজগুলি করতে হয়, সেগুলি আমি পারিনা ! আমি করিনা । সেজন্য তাদের পত্রিকায় নিয়মিত লেখা ছাপানোর যে সুযোগ বা পরিসর সেটা আমি পাইনা । আমি তারজন্য খুব একটা চিন্তিত নয়, এই কারণে যে আমি তো নিজের কাজটা করেই যাচ্ছি । ধরুন, এই ২০১৬ তে আমার প্রথম ৫০০ কপি বেরুল, ‘অবগুন্ঠন’ বেরিয়েছিল ২০১৫-র নভেন্বরে ৫০০ কপি, সেটা ফুরিয়ে গেল বইমেলায়, ফেব্রুয়ারি মাসে । আবার নতুন ভাবে বের করলাম, মালকোষ, এটাও ভালই বিক্রি হচ্ছে, এই ধরুন একমাসও হয়নি, ১০০ কপি বিক্রি হয়ে গেছে ।
অক্ষয়চাঁদ ছদ্মনাম, আসল নাম স্বপন বিশ্বাস । জানা গিয়েছিল, বইটির ভেতরের পৃষ্ঠায়, এ কালেকশন অফ বেঙ্গলি পয়েমস বাই স্বপন বিশ্বাস—থেকে । প্রকাশনা সংস্থা হিশেবে নাম আছে, উপমা, কবির ছোটো মেয়ে । গ্রন্থস্বত্ব, তৃতীয়া বিশ্বাস, বড়ো মেয়ে । বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে । তিনজনের সংসার কবিতার বই বিক্রি করে চালিয়ে নেন, কবি স্বপন বিশ্বাস । প্রতিদিন ৬ কপি করে বই নিয়ে বের হন, নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে । ৬টির দাম ৪৮০ টাকা । আমাকে বোঝালেন, মোটামুটি ৫০০ টাকা হলে, একদিনের সংসার খরচ চলে যায় । কালের পর পরশু, বা তার পরের দিন কীভাবে চলবে এ নিয়ে আদৌ চিন্তিত নন । কবি অক্ষয়চাঁদের আর একটি কবিতা :
অন্ধকারে বৃষ্টি থামলো
অন্ধকারে বৃষ্টি থামলো, বৃষ্টির শব্দে ভেঙে পড়েছে চারদিক
আমাদের কথা, সারাদিন আমরা যে যার কথা
মনে মনে গুনগুন করেছি,
সারাদিন আমরা পরস্পর ক্ষতবিক্ষত উজ্জ্বল,
সারাদিন হয়ত আমাদের মতো যেখানে যত মানুষ
যে যার কথা ভাবতে ভাবতে নিশ্চুপ ।
শুধু বৃষ্টির শব্দ অন্যরকম কথার মতো, মাঝেমাঝে
বিদ্যুৎ ঝলক । চারদিক আঁকড়ে ধরেছে জোড়া
জানালার অপরাহ্ণ, বৃষ্টির কুজন; সারাদিন আমরা অন্ধের মতো
যে যার কথার ভেতর শুনেছি অন্যমনস্ক চুম্বনের শব্দ,
অন্ধকারে বৃষ্টি থামলো ।
৫০০ কপি বই ছাপানোর খরচ তো অনেক ! বই বিক্রির টাকা তো সংসারে, তাহলে কীভাবে ছাপানো হয় কবির বই ? এখানে অন্য একটি গল্প আছে । এগিয়ে আসেন কবির বন্ধুরা । তাদের নামগুলি, তিনি কৃতজ্ঞতায় উল্লেখ করেন প্রতি বইয়ে । এই বইটির কৃতজ্ঞতা স্বীকারে তিনি নাম রেখেছেন, ‘সর্বশ্রী সনাতন দিন্দা, পুলক পাঠক, কৃপারাম দ্বিবেদী, সুনীল বিশ্বাস, অতীশ চট্টোপাধ্যায়, সুরজিৎ পোদ্দার, অজয় বসু রায়’ । এমনিতে কারুরই সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখতে নারাজ তিনি, কখনো কোথাও দেখা হলে, কথা হয়, এটুকুই ঠিক আছে । নিয়মিত যোগাযোগ থেকে স্বার্থের ব্যাপার এসে পড়ে, এবং তার থেকে তৈরি হয় সংকট । এই সংকট থেকে দূরে থাকতে হবে , একা থাকতে হবে, নাহলে শূন্যকে অনুভব করা যাবে না । এই বইয়ের প্রথম কবিতার নাম, মহাশূন্যময় ।
‘এক না জ্বলা উনুন সারাদিন ধ্যানস্থ বুদ্ধের মতো কোন বোধ সঞ্চারিত করে’ । একটি কবিতার লাইন । প্রকৃতই দারিদ্রের মধ্য দিয়ে কেটেছে এক সময় এই কবির জীবন । কবিতা লেখা থেমে যায়নি তবুও । এখন কিছুটা সচ্ছল তাঁর পারিবারিক জীবন । সবই এই কবিতার বই বিক্রি করে । প্রায় বিয়াল্লিশ বছর তিনি কবিতা লিখছেন । একসময় মাড়োয়ারি অফিসে খাতা লেখার চাকরী পেয়েছিলেন, টেকে নি । গুঁড়ো চায়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন একসময় । এখন আর নেই । সম্পাদকের তাড়া খেয়ে লেখা যখন বছর বছর ভুরি ভুরি রচিত হয়ে চলেছে, কবি স্বপন বিশ্বাসের জীবনে কোনো সম্পাদক নেই । কবিতা লিখছেন, একেবারে কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হবে । এই বইয়ের কোনো কবিতাই পূর্বে কোনো পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়নি, এমন কোনো বিজ্ঞাপনও নেই । সম্ভবত এই সব বিজ্ঞাপনের আলাদা কোনো মূল্যও নেই তাঁর কাছে । যে বইটি পড়ছি, এটি দ্বিতীয় মুদ্রণ, কিন্তু তার কোনো উল্লেখই নেই এ বইয়ে, উল্লেখের প্রয়োজনও নেই তাঁর জীবনে । রাত্রি বারোটার পর কবিতা লিখেন তিনি । এফ.এম রেডিওতে শোনেন, রাগপ্রধান সঙ্গীতের অনুষ্ঠান, রাত্রি বারোটায় । মালকোষ, রাত্রিবেলার রাগ, তাঁর প্রিয় রাগ, বইয়ের নামকরণে সেই প্রিয় রাগটিকেই নিয়েছেন তিনি ।
বই বিক্রি করতে গিয়ে অপমানিতও হতে হয় । তিনি মনে করেন, এক অর্দ্ধশিক্ষিতের সমাজে বসবাস করছি আমরা, যেখানে এখনও অব্দি কোনো ফাইন আর্টসের জায়গা নেই । অনেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে । তিনি মনে করেন, পৃথিবীতে সেই মানুষটি-ই কবি যে হচ্ছে বোকা ! বুদ্ধিমান মানুষ, চালাক মানুষ আর যাই হোক কবি হতে পারেন না । সমাজে কবি সেই ব্যক্তিটি যে ব্যক্তিটি অভিশপ্ত মানুষ, যে মানুষ অভিশপ্ত নয় সে কবিও নয় । কবিও অসৎ, সে সংসারে অসৎ, সে ঈশ্বরের ঘরে অসৎ কারণ ঈশ্বরের সঙ্গে তার বিরোধিতা আছে । সমাজ সংসারে কবি-ই হচ্ছেন ট্র্যাজেডির নায়ক, যার সব সম্ভাবনা ছিল কিন্তু সমস্তকে হত্যা করে শুধু কবিতার সম্ভাবনাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ।
অনেকদূর এলাম
দেখতে দেখতে অনেকদূর এলাম
তোমাকে প্রণাম করবো বলে, এতদূর
কী আসার কথা ছিল, দেখার কথা ছিলো
কতরকম আলোর কতরকম রঙ ।
কতরকম কাঁটাগাছ কতরকম মরু
পেরিয়ে এলাম তোমার প্রেরণায়,
এখন আমি তোমার ছায়ায়, ভীরু,
চেয়ে দেখি তুমি লুপ্ত আপনমায়ায় ।
এইভাবেই আমার রচনা আমার প্রণাম,
চলাচল, সকলছন্দ, নিটোলশব্দ,
যেমন মিলন, হাতের ওপর হাতখানি,
গানের পর গান অনেকদূর এলাম ।
সুদেব বকসী, কবি ও সম্পাদক, এই কবির সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত । তিনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা তিরপূর্ণি তে ছাপিয়েছিলেন এই কবির কবিতা । সুদেবদা বলেন, ‘এরাই আসলে কবি । খুব ভেবে চিনতে হিসেব করে তো আর কবি হয়না । এদের জীবনটাই কবিতা লেখায় ।’শুধু সুদেবদাই নন, কবি স্বপন বিশ্বাসের গুণমুগ্ধ অনেকেই রয়েছেন, আগেও তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে ফেসবুকে । তবে, তিনি এই ফেসবুক, বা যে কোনো রকমের প্রচার থেকে দূরে, কবিতার নিবিড় আশ্রয়ে রয়েছেন নিজের মতো করে ।
তোমার দুর্ভাগ্য তোমার গৌরব,
পা মাথা সর্বাঙ্গে ধুলো, যেন
বিগ্রহ, আদ্যোপান্ত একা ।
ভাঙাচোরা আলোয়, তোমার শরীর,
অংশত পাথর অংশত লুপ্ত ।
তুমি নিজেকে আঁকতে পারো
অন্ধকারে, অনাগ্রহে, অক্ষমতায় ।
তোমার বিমূর্ত এই রূপ তথাগত স্বয়ং ।
..........
পাঁচ বছর আগের লেখা। এরপর অক্ষয়চাঁদ এর সঙ্গে একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, আরও অনেক বিস্ময় পেরিয়ে, তাঁকে কিছুটা বোঝা গিয়েছিল। দীর্ঘ দীর্ঘ ফোনালাপ, তাঁর কবিতা বিষয়ক কথাবার্তা থেকে এটা বোঝা যেতো, উনি কবিতা লিখবেন বলেই জন্মেছিলেন। খুব বেশিদিন হয় নি, প্রয়াত হয়েছেন। এবার আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে, তাঁর যা কিছু বইপত্র, কবিতা!
--স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত











ওনাকে নিয়ে এরকম কাজ আরো হওয়া দরকার
উত্তরমুছুনএটা একটা কাজের মতো কাজ হয়েছে
উত্তরমুছুন